যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে ক্রন্দনরত শিশুর আলোড়ন তোলা ছবি

যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে ক্রন্দনরত শিশুর আলোড়ন তোলা ছবি

যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত এলাকায় অভিবাসনপ্রত্যাশী মায়ের সঙ্গে আটক আছে এই শিশুও। টাইম ম্যাগাজিন এই ছবির সঙ্গে ট্রাম্পের ছবি বিশেষভাবে উপস্থাপন করে তাদের আগামী প্রচ্ছদসংখ্যা ছাপাচ্ছে। টাইম ম্যাগাজিনের ছবিটি প্রকাশ করেছে রয়টার্স।

 

গোলাপি রঙের জ্যাকেট পরা ছোট্ট এক শিশু আকুল হয়ে কাঁদছে। তার দৃষ্টি পাশে দাঁড়ানো দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিকে। ছবির ফোকাসে শুধু শিশুটি থাকায় প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দুজনের মুখ দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের শুধু পা দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক দিনে এই ছবিটি অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষদের প্রতীকী ছবিতে পরিণত হয়েছে। হৃদয়গ্রাহী এই ছবিটির মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অসহায়ত্বের চিত্রই যেন ফুটে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো সীমান্তে গ্রেপ্তার হওয়া অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে তাঁদের সন্তানদের বিচ্ছিন্ন করে খাঁচার মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। যদিও বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পড়ে গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক নির্বাহী আদেশে আটক অভিবাসীদের সঙ্গে শিশুদের একসঙ্গে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গেটি ইমেজের চিত্রগ্রাহক জন মুর সীমান্ত এলাকায় হন্ডুরাসের ক্রন্দনরত শিশুটির ছবি তোলার পর তা ব্যাপক আলোচিত হয়। টাইম ম্যাগাজিন এই ছবির সঙ্গে ট্রাম্পের ছবি বিশেষভাবে উপস্থাপন করে তাদের আগামী প্রচ্ছদ সংখ্যা ছাপাচ্ছে।

শিশুটিকে নিয়ে গতকাল শুক্রবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুটির বাবা দাবি করে ডেনিস ভালেরা নামের এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ে মায়ের সঙ্গে মেক্সিকো সীমান্তে আটক আছেন। তাঁর মেয়েকে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। সে মায়ের সঙ্গেই আছে।

রয়টার্সের সঙ্গে টেলিফোনে ডেনিস ভালেরা বলেন, ‘আমার মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত এলাকায় মা-বাবার কাছ থেকে শিশুদের বিচ্ছিন্ন করার ঘটনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ছবিটি হয়তো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হৃদয় স্পর্শ করেছে।’

ডেনিস ভালেরা আরও বলেন, তাঁর স্ত্রী সানড্রা সানচেজ ও মেয়ে একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য টেক্সাসের সীমান্ত শহর ম্যাক অ্যালেনে আটক আছে। স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন। আটকের পর মা-মেয়েকে আলাদা করা হয়নি।

শিশুটির বাবা ডেনিস ভালেরার বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন হন্ডুরাসের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী নেলি জেরেজ।

ভালেরা আরও বলেছেন, টেলিভিশনে মেয়ের ক্রন্দনরত ছবিটি প্রথমে দেখে তিনি প্রচণ্ড কষ্ট পান। তিনি বলেন, অমন একটি ছবি দেখে যে-কারও হৃদয় ভেঙে যাবে।

হন্ডুরাসের রাজধানী তেগুসিগাল্পার উত্তরে বন্দর এলাকা পুয়ের্তো কোরটেস থেকে সানচেজ তাঁর মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত এলাকায়। ভালেরা জানান, তিনি আর তাঁর আরও তিন সন্তানকে না বলেই স্ত্রী শিশুকন্যাকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর স্ত্রীর পরিবারের লোকজন আছে। তাই তিনি অনুমান করেছিলেন, স্ত্রী আরও ভালো অর্থনৈতিক সুযোগ লাভের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন।

ভালেরা বলেন, তাদের ফেরত পাঠানো হলেও আপত্তি নেই। তবে যেন তাঁর মেয়েকে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা না হয়। শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখার জন্য তিনি অপেক্ষায় আছেন বলে জানালেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তহবিল গঠনকারীরা এই ছবি ব্যবহার করার পর ব্যাপক সাড়া পড়ে। শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আইনগত সহায়তার জন্য টেক্সাসভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড ইমিগ্রান্ট সেন্টার ফর এডুকেশন অ্যান্ড লিগ্যাল সার্ভিসেস (রেইসেস) প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কাছ থেকে ১৭ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার বেশি) সাহায্য পেয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে গত ৫ মে থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৩৪২ জন শিশুকে তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আটককেন্দ্রে রাখা হয়।

খাঁচার মধ্যে আটক রাখা ওই শিশুদের কান্নার ভিডিও, অডিও টেপ ও চিত্রগ্রাহক মুরের এই ছবি ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেই ট্রাম্প ২০১৬ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে অভিবাসনবিরোধিতা এখনো প্রবল। তবে গত কয়েক দিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনবরত ক্রন্দনরত শিশুদের ছবি প্রচারের ফলে দেশে-বিদেশে সব মহল থেকেই তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন।

বুধবার এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে গ্রেপ্তার অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে তাঁদের ছেলেমেয়েদের বিচ্ছিন্ন করার নীতি সাময়িকভাবে রদের সিদ্ধান্ত নেন। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশে এখন সীমান্ত এলাকায় আটক অভিবাসীদের সঙ্গে তাঁদের শিশুদেরও রাখা হবে। আদেশে ট্রাম্প এসব বহিরাগত লোকজনের ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করারও নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পরিবারের সঙ্গে আটক শিশুদের ২০ দিনের মধ্যে মুক্ত করার জন্য বিদ্যমান আইনের বিরুদ্ধে আপিল করতেও তিনি বিচার বিভাগকে নির্দেশ দেন।

 

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো